দেশের গ্রামাঞ্চলে এক সময় রাতের অন্ধকার দূর করার প্রধান মাধ্যম ছিল হারিকেন, যা কেবল একটি আলোর উৎসই নয়, বরং গ্রামীণ জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল; তবে বিদ্যুতায়নের বিস্তার, সোলার প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং আধুনিক এলইডি আলোর ব্যবহারের ফলে সেই হারিকেন এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে, নতুন প্রজন্মের কাছে এটি ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যাচ্ছে এবং পুরোনো প্রজন্মের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
বর্তমানে দেশের অধিকাংশ গ্রাম বিদ্যুতের আওতায় চলে আসায় রাতের অন্ধকার দূর করার জন্য মানুষের আর হারিকেনের ওপর নির্ভর করতে হয় না; একই সঙ্গে চার্জার লাইট, সোলার হোম সিস্টেম এবং কম বিদ্যুৎ খরচের এলইডি বাতি সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ দ্রুত আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকেছে, যার ফলে হারিকেনের ব্যবহার প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং স্থানীয় বাজারগুলোতেও এর চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, অনেক দোকানদারই এখন আর এই পণ্য বিক্রি করেন না।
এক সময় গ্রামবাংলার প্রতিটি পরিবারেই একাধিক হারিকেন থাকা ছিল স্বাভাবিক বিষয়, যেখানে সন্ধ্যা নামার আগেই সেগুলো পরিষ্কার করা, কেরোসিন ভরা এবং সলতে ঠিক করা ছিল দৈনন্দিন রুটিনের অংশ; সেই আলোতেই চলত পড়াশোনা, রান্নাবান্না এবং পারিবারিক আড্ডা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কৃষিকাজের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হতো, যা হারিকেনকে শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং একটি নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো সেই হারিকেনের আলো স্পষ্ট হয়ে ভাসে, যেখানে তারা জানান যে বিদ্যুৎ না থাকায় এই কেরোসিন বাতিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা এবং সেই আলোতেই তারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো পার করেছেন; অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের কাছে এই অভিজ্ঞতা প্রায় অজানা, কারণ তারা এমন এক সময়ে বড় হচ্ছে যখন বিদ্যুৎ ও আধুনিক আলোর ব্যবস্থা সহজেই পাওয়া যায়, ফলে হারিকেন তাদের কাছে একটি পুরোনো জিনিস হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন, প্রযুক্তির সহজপ্রাপ্যতা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নই এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে; পাশাপাশি কেরোসিনের ক্রমবর্ধমান দাম এবং এর ধোঁয়ার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও মানুষকে হারিকেন ব্যবহার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, যা আধুনিক আলোকসজ্জার গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের ফলে কিছু নেতিবাচক প্রভাবও দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে যারা হারিকেন তৈরি, বিক্রি বা মেরামতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন; এক সময় যাদের জীবিকা নির্ভর করত এই পণ্যের ওপর, তাদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, গ্রাম বাংলার দ্রুত পরিবর্তিত জীবনযাত্রার ধারায় হারিকেন এখন অতীতের অংশ হয়ে উঠছে, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ ও নিরাপদ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের পরিচিত ও আবেগঘন একটি উপকরণ; তবুও গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে হারিকেন মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে, যা একটি ভিন্ন সময়ের সরলতা ও জীবনধারার প্রতীক হয়ে থাকবে।


