হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডে অস্থিরতা; বিদেশি জিএম নিয়োগ ও কর্মকর্তা অপসারণে ক্ষোভ (পর্ব ১)
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (HIL) এবং রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁও হোটেলকে ঘিরে নতুন করে তীব্র অস্থিরতা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কোম্পানি সেক্রেটারি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য পরিবর্তনের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নথি, অভিযোগপত্র ও বোর্ড সভার এজেন্ডা প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক মহলসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মহিদুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। এই নামটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে বহন করে আসছে এবং চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি, ঐতিহ্য ও ব্র্যান্ড ভ্যালুর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
বোর্ড সভার নথিতে দেখা যায়, কোম্পানির নাম পরিবর্তনের জন্য RJSC অনুমোদন, বিশেষ সাধারণ সভা (EGM), বোর্ড রেজুলেশন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তীব্র বিরোধিতা এবং অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বেতন বৃদ্ধি সীমিত করা, পদোন্নতি কমিয়ে আনা, বিভিন্ন সুবিধা হ্রাস এবং প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনায় উঠে এসেছে অর্থ বিভাগের প্রধান ও এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (ইএএম ফাইন্যান্স) আসিফ আহমেদের নাম। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হঠাৎ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়। অথচ তিনি একাধিকবার ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় হোটেলে অবস্থান করা এবং অফিসিয়াল গাড়ি ব্যবহারের মতো প্রশাসনিক বিষয়গুলোকে এখন তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টিকে পরিকল্পিত হয়রানি বলেও মনে করছেন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এদিকে, বিদেশ থেকে নতুন একজন জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘিরেও ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নতুন এই বিদেশি জিএমের পেছনে মাসিক প্রায় ৩০ লাখ টাকারও বেশি বেতন ও সুযোগ-সুবিধা ব্যয় হবে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, যখন প্রতিষ্ঠানে ব্যয় সংকোচনের কথা বলে পুরোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা কমানো হচ্ছে, তখন বিপুল ব্যয়ে বিদেশি জিএম নিয়োগ সম্পূর্ণ স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত।
আরও অভিযোগ উঠেছে, নতুন জিএমকে দায়িত্ব দিয়ে পুরোনো ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে আসিফ আহমেদকে চাকরিচ্যুত করার জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগও এসেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, বিদেশি জিএম নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য প্রশাসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা।
সবচেয়ে মানবিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে আসিফ আহমেদের শারীরিক অবস্থা। জানা গেছে, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং ওপেন-হার্ট সার্জারির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন অবস্থায় তাঁর বাসায় চাকরিচ্যুতির নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি চিকিৎসাজনিত কারণে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার আবেদনও গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মহিদুর রহমানের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ছাত্রজীবনে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজস্ব বলয় তৈরির চেষ্টা করছেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও সোনারগাঁও হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ বলছে, “একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল করা হচ্ছে। বিদেশি জিএম নিয়োগ, পুরোনো কর্মকর্তাদের অপসারণ সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।”
তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। (চলবে…)


